Home ব্যবসায়িক পরামর্শ ভিডিও গেম ব্যবসা
ভিডিও গেম ব্যবসা

ভিডিও গেম ব্যবসা

by Tandava Krishna

নিজের অনলাইন গেমিং ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে?

ভাবুন তো বাড়িতে বসে গেম খেলে যদি টাকা রোজগার করা যেত তাহলে কতই না ভালো হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠতে জ্বর আসত না, সোমবার এলে কান্না পেতো না। আহা! কি সুখের জীবনই না হতো! কিন্তু আমি যদি আপনাকে বলি এরকম হওয়া সম্ভব। আর শুধু সম্ভবই নয়, এরকম হয়, হচ্ছে। আমার আপনার পরিচিত অনেক ছেলে মেয়েই (ইউ গভ ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী ৩১% পুরুষ আর ২১% মহিলা) অবসরে অনলাইন গেম খেলে উপার্জন করছে অর্থ।

বিনিয়োগ সংস্থা মেপল ক্যাপিটাল এডভাইজার্সের, ” গেমিং – ইন্ডিয়া স্টোরি ” শীর্ষক সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে ভারতে ৪০০ টি গেমিং স্টার্টআপ সক্রিয় আছে। তার বেশিরভাগই মোবাইল গেমিং। অনলাইন গেমিংয়ের তিনটি বিভাগ আছে; রিয়েল মানি গেম বা বেটিং খেলা, মোবাইলের সহজ খেলা বা ক্যাসুয়াল গেম এবং ই স্পোর্টস খেলা।

কভিড ১৯ এর প্রকোপে যখন বেশিরভাগ মানুষকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিতে হলো নিজেদেরই বাড়িতে, হঠাৎ তখন তারা আবিষ্কার করলেন একটি নতুন জগৎ। তার আগে থেকে অবশ্য পাব জি, ক্যান্ডি ক্রাশ ইত্যাদি খেলতেন অনেকে কিন্তু হঠাৎ পাওয়া অবসরে, ইন্টারনেট পরিষেবা ভোগী জনসাধারণের একটি সমূহ (ইউ গভ সমীক্ষা অনুযায়ী ২৯%) দৈনিক ভাবে অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেখা যায় অনলাইন গেমিং বা বিশেষ করে বেটিং গেম গুলির বিপুল জনপ্রিয়তা। আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক লাভ করে এই ব্যবসাগুলি বার্ষিক হারে। আর বর্তমান সামাজিক দূরত্বের প্রভাবে দিন দিন বেড়ে চলেছে এই গেমিং পরিষেবার চাহিদা। আর তাই প্রচুর প্রতিযোগী এসেও গেছে ব্যবসার ক্ষেত্রে। ভারতবর্ষের আইনত ও নীতিগত কারণের জন্য বেটিং গেম এতদিন সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি অনলাইন খেলার জগতে। কিন্তু যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে গেমিংয়ের হাওয়া দিক পাল্টিয়েছে। রামি, পোকার ইত্যাদি বেটিং গেম, পাব জি আর ক্যান্ডি ক্রাশের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে তৈরী হয়েছে অনলাইন খেলার বাণিজ্য।

এই বাণিজ্যে বিনিয়োগ করার আগে জেনে নিতে হবে ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে কতগুলি নৈতিক বিষয়। যথা:

  • পাবলিক গ্যাম্বলিং এক্ট ১৮৬৭ অনুযায়ী এরকম কোনো খেলা বৈধ নয় যাতে মানুষ শুধু মাত্র ভাগ্যের মতো একটি অনির্দিষ্ট কারণে টাকা হারাতে পারে। কিন্তু, কোনো খেলাতে যদি ভাগ্যের সাথে সাথে নৈপুণ্য, যোগ্যতা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা লাগে, সেই খেলা বৈধতা পেতে পারে।
  • গেমিং আর গ্যাম্বলিং, ভারতবর্ষের আইন অনুযায়ী, রাজ্যের শাসন আওতায় পড়ে। আর এখনো পর্যন্ত কোনো রাজ্য রিয়েল মানি গেমকে বন্ধ করেনি।
  • আসাম, উড়িষ্যা, তেলেঙ্গানায় দক্ষতা দিয়ে যে অনলাইন গেমগুলি জিততে হয় সেগুলি অবৈধ।
  • অনলাইন স্কিল গেম্স্ বা দক্ষতার খেলাগুলি বৈধভাবে বাণিজ্য করতে বিশেষ লাইসেন্স বা অনুমতিপত্রের প্রয়োজন আছে।
  • অনলাইন গেমিং পরিষেবা সরকার দ্বারা কঠিন ভাবে নিয়ন্ত্রিত। যথাযত কাগজপত্র ও কর দিয়ে, অনুমতিপত্র আবেদন করলে, যে সকল রাজ্যে ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে অনলাইন গেম্স্ অফ স্কিল বৈধ, সেখানে পরিষেবা দেয়ার ও বিভিন্ন অনলাইন সাইটে বিজ্ঞাপন দেয়ার অনুমতি পাওয়া যায়।
  • উদ্যোক্তাকে মোট রেভেনিউয়ের ০.৫% সরকারকে দিতে হয় গেমিং কর বা রয়ালটি বাবদ।
  • আবেদন করার ৬ মাসের মধ্যে লাইসেন্স পাওয়া যায়, যদি সব কিছু সন্তোষজনক পায় সরকারি বিভাগ।
  • লাইসেন্সের বৈধতা, প্রাপ্তির দিন থেকে পরবর্তী ৫ বছর বহাল থাকে।

অনলাইন গেম ব্যবসা শুরু করার পদক্ষেপ কি কি?

  • আইনগত জটিলতার বিষয় খেয়াল রাখবেন। কর, শাসন ব্যবস্থা, অনুমতিপত্রের সময় সীমা ইত্যাদি বিষয়ের জন্য তৈরী থাকবেন।
  • ব্যাঙ্ক একাউন্ট ও বৈধ আর্থিক প্রণালী কার্যকর করুন ।  
  • ভালো সফ্টওয়ার সার্ভিসে বিনিয়োগ করুন। এই সফ্টওয়ার পরিষেবাই আপনার ব্যবসা আনবে। ভালো পরিষেবা না হলে, উপভোক্তাদের গেমিংয়ের অভিজ্ঞতা একদমই সুখকর হবে না। তাতে আপনার ব্যবসার ক্ষতি হবে। বেশি বিনিয়োগে উঁচু দরের সফ্টওয়ার পরিষেবা কিনুন। আখেরে আপনারই লাভ হবে তাতে।
  • অর্থ প্রদান পরিষেবা বা পেমেন্ট পরিষেবা ঠিক করুন যাতে আপনার বাণিজ্যে সহজে আর নিরাপদে টাকা আদান প্রদান হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গেমিং সফ্টওয়ার আপনাকে প্যাকেজ ডিলে এই পরিষেবাটি দিতে পারে। যদিও সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ কিছুটা বেশিই পড়বে আপনার।
  • প্রচার ব্যবস্থা বা মার্কেটিং খুব জোরদার করতে হবে। আর শুরু করতে হবে ব্যবসা শুরুর আগে থেকেই। প্রথমে বাজার বুঝে নিন, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী কারা, তাদের দুর্বলতা বা শক্তি কি কি, জনসাধারণের কিরকম চাহিদা ইত্যাদি বুঝে তারপর আপনার পরিষেবাটি বাজারে আনুন এবং অভিনব উপায় তার প্রচার করুন অনলাইনের বিভিন্ন জায়গায়। শুধুমাত্র ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম নয় পৌঁছে যান ইউটিউব শিল্পীদের কাছে। স্পন্সর করুন বিভিন্ন ভিডিও। অন্যান্য গেমিং এপ্লিকেশন আর ওয়েবসাইটেও দিন আপনার বিজ্ঞাপন।
  • বাজেট বানাতে ভুলবেন না। আইনত জটিলতা, প্রযুক্তিগত সমস্যা, প্রচারের ঝক্কির পরেও আপনাকে ভাবতে হবে ওপোরেশনাল সময়ের জন্য কত খরচ হতে পারে। অন্তত দু বছরের বাজেট নির্ধারণ করে তবেই মাঠে নামুন।

আসুন, জটিল বিষয়টি সার সংক্ষেপে আরেকবার বুঝে নি আমরা। একটি অনলাইন গেমিং ব্যবসা শুরু করতে গেলে আপনাকে এই কটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:

১)একটি বিস্বস্ত তথ্য প্রযুক্তি পরিষেবা

২)গ্যাম্বলিংয়ের সরকারি ছাড়পত্র

৩)পেমেন্ট পরিষেবা

৪) শক্তিশালী মার্কেটিং যা টানবে নতুন উপভোক্তা আর ধরে রাখবে পুরোনো দের

গ্যাম্বলিং লাইসেন্স, পেমেন্ট পরিষেবা ও সফ্টওয়ার পরিষেবা, এই তিনটি কাজের এক জায়গায় সমাধান পাওয়া, যা এক একটি জাতি গোষ্ঠীর জন্য টেলারমেড হবে, একজন উদ্দোগতার পক্ষে সৌভাগ্যজনক। এইরকম বিশেষ পরিষেবার তাই প্রবল চাহিদা তৈরী হয়েছে যাকে হোয়াইট লেবেল সলিউশান বলা হয়।

একটি অনলাইন গেমিং ব্যবসা চালু করা সহজ কাজ নয় । সাধারণত ভাবে দেখতে গেলে এই ব্যবসা  কোথায় করতে চান, সেই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক তা নয়। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে রাজনৈতিক নীতিই ব্যবসার ছাড়পত্র আয়ত্ত হবে কি হবে না সেটা ঠিক করে দেয়। তাই রাজনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ব্যবসার অবস্থানের ভৌগোলিক বিশেষত্বটিও কিন্তু অবহেলা করা যাবেনা। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানই নির্ধারণ করে দেয় সেখানকার মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট। আর বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন পছন্দ অপছন্দের কথা মাথায় রেখেই বানাতে হবে অনলাইন গেমিং ব্যবসার ব্লিউ প্রিন্ট। তাছাড়াও নির্দিষ্ট সামাজিক নৈতিকতার কথা মেনেও আবদ্ধ রাখতে হবে ব্যবসার গতি প্রকৃতি। বিশেষ করে যদি ব্যবসার অবস্থান হয় রক্ষণশীল সমাজে।

সবারই জানা ঘটনা, একটি বিখ্যাত পেমেন্ট গেটওয়ে, গেমিং ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল সম্প্রতি। আর বিশ্ব বিখ্যাত যুদ্ধের খেলা নিয়ে একটি অনলাইন গেম নিষিদ্ধ হয়ে গেলো রাজনৈতিক কারণে। আবার দেশজ উৎপত্তি নিয়ে তার জায়গায় আসতে চলেছে সেইরকমই আর একটি অনলাইন খেলা, একজন মহা তারকার হাত ধরে। অনলাইন গেমিং ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলে এই ধরণের চাপানোতরের জন্য প্রস্তুত রাখবেন নিজেকে।

স্মার্টফোনের সহজ লভ্যতা অনলাইন গেমিং বাণিজ্যের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এখন স্মার্টফোন ব্যবহার করেন ও ফোন ঘেঁটেই সময় কাটান। তাই বিশেষ রূপে মোবাইল ফোনের জন্য বানানো অনলাইন গেমিং এপ্লিকেশনগুলির চাহিদা অত্যন্ত তুঙ্গে ।  

ক্রমাগত চেষ্টা করে যেতে হবে যাতে আপনার গেমিং পরিষেবায় আপনার উপভোক্তারা খুশি হয়, আর আপনার ভাগেও লাভের অংশ বাড়ে। আপনার সফ্টওয়ার কর্মী আর আপনার মার্কেটিং কর্মী; এদের যুগ্ম কাজেই আপনার ব্যবসা বাড়বে।

করোনা আবহে প্রত্যেকদিন গৃহবন্দী মানুষ আরো বেশি বেশি করে অনলাইন গেমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। ফলে এই বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোক্তার আগমন হয়েছে। বিভিন্ন দক্ষতার খেলা বা গেম অফ স্কিল যদি বাজারে আসতে থাকে এভাবে, সরকারি নির্দেশ সূচি মান্য করে তাহলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে অদূর ভবিষ্যতে একদিন অনলাইন গেমিংএর ব্যবসা প্রভূত আয় সৃষ্টিকারী বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় পরিণত হবে।

Related Posts

Leave a Comment