Home ব্যবসায়িক পরামর্শ টি-শার্ট ডিজাইনের ব্যবসা
টি-শার্ট ডিজাইনের ব্যবসা

টি-শার্ট ডিজাইনের ব্যবসা

by Tandava Krishna

কাস্টম টিশার্ট ডিসাইন ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে?

একটা সময় ছিল যখন কাজকারবারে ছেলেদের গলাবন্ধ, ফুলহাতা শার্ট আর মেয়েদের পাটভাঙা শাড়ি না পড়লে চলতো না। টি শার্ট তখন ছিল কলেজ পড়ুয়া আর রক প্রেমীদের ইউনিফর্ম। তারপর ধীরে ধীরে যুগ পাল্টালো, টি শার্ট ঢুকে পড়লো বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাত ধরে অফিসগামীদের সপ্তাহান্তের দিনগুলিতে। তবে সেই টি শার্ট একটু হলেও প্রথাগত। কিন্তু বাজারে বর্তমানে একটি বিশাল চাহিদা তৈরী হয়েছে ডিজাইনার টিশার্টের বা গ্রাফিক টিশার্টের 

কেন এই চাহিদা?

সময়ের সাথে যত সমাজ উন্মুক্তমনা হয়েছে তত যুবসমাজ বাধা নিষেধের বেড়াজাল ভেঙে প্রতিবাদ ব্যক্তি স্বাধীনতাকে আপন করে নিয়েছে। নিজের পরিচয়, ব্যক্তিত্ব মানসিকতা এখন নিজের কাজে কথায় শুধু নয় বরং নিজের উপস্থিতি পোশাকেও প্রকাশ করতে চাইছে। তাই সানিয়া মির্জার টিশার্টে, ” গুড গার্লস সেলডম ক্রিকেট হিস্ট্রি ”, একসময় চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। সেই উচ্ছাস আজ আই টি তে কাজ করা পুজোয় ছুটি না পাওয়া কর্মীর টিশার্টেনহি যন্ত্র নহি যন্ত্র আমি প্রাণীতে বিদ্যমান।

তাই বাজারে কাস্টম মেড টিশার্টের যে অত্যন্ত বেশি চাহিদা এই চাহিদা পূরণের জন্য অনেক সংস্থা যে লেগে পড়েছে তাতে আর আশ্চর্য কি? অনেক উদ্যোগপতিরা বিশেষত নবীনরা শুরু করতে চাইছে কাস্টম মেড টিশার্টের ব্যবসা। আবার অনেক শিল্পীরাও তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু উপার্জনের স্বপ্ন দেখছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় এটি একটি আকর্ষণীয় ব্যবসা যাতে লাভের হিসেবে মন্দ নয় যদি সঠিক ভাবে এগোনো যায়।

সুবিধা ও অসুবিধাগুলি কি কি?

সুবিধা – এই ব্যবসা ন্যূনতম বিনিয়োগে করা যায়

অসুবিধা – প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা

প্রতিযোগিতা প্রধান অসুবিধে হলেও এই প্রতিযোগিতাকেই আপনাকে নিজের কাজে লাগাতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আপনার ইউ এস পি বা  উনিক সেলিং পয়েন্ট। এখানেই কাস্টম মেড কথাটা প্রযোজ্য।

যথাযথ যোগান:

নিশ্:

এই কথাটা আপনি নিশ্চই শুনে থাকবেন। কখনো নন্দনে সিনেমা দেখে কিছু বুঝতে না পেরে অনেকেই বলে এই সিনেমাটা একটা নিশ্ অডিয়েন্সের জন্য। অর্থাৎ একটি গোষ্ঠী যারা এই নির্দিষ্ট সিনেমাটি পছন্দ করবে। আর কাস্টম টিশার্টের ব্যবসায় এই নিশ্ কথাটিই হলো মূল। আপনাকে খুঁজতে হবে এক একটি দল, যাদের একটি সুনির্দিষ্ট পছন্দ আছে। আর এই দল গুলি যত নির্দিষ্ট হবে তত ভালো। উদাহারণ দিয়ে বুঝিয়ে বলছি। ধরুন একটি দল আছে যারা বেড়াতে ভালোবাসে তারা ভ্রমণ বিষয়ক ডিসাইন বা গ্রাফিতি পছন্দ করবে। কিন্তু আপনি যদি আরো নির্দিষ্ট বা স্পেসিফিক হতে চান  তাহলে আপনি পাবেন আরো অনেক দল যারা কেউ পাহাড়, কেউ সমুদ্র, কেউ অরণ্য ভালোবাসে। ঠিক এইভাবে পছন্দ, পেশা, জীবনযাত্রা ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীতে আপনি সনাক্ত করতে পারবেন আপনার টার্গেট অডিয়েন্স বা ক্রেতাকে।

এই কার্যসাধনের কিছু পদ্ধতি:

  • আপনি দেখতে পারেন রেডিট বা সাবরেডিট আপনার সম্ভাব্য ক্রেতার। সাব্স্ক্রাইবারের সংখ্যা ও আলোচনা আপনাকে ধারণা দেবে 
  • ফেসবুকের অডিয়েন্স ইনসাইটস টুল আপনাকে আপনার সম্ভাব্য ক্রেতা গোষ্ঠী কত টা বড় বলে দেবে। 
  • একটু গবেষণা করুন প্রচলিত শখ বা হবি নিয়ে।  
  • নিজের ও চারপাশের মানুষদের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে ওয়াকিবহাল হন।

যে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি মনে রাখতে হবে:

ডিসাইন:

শিল্পকলাটি অবশ্যই হতে হবে আদি ও আসল। তাছাড়া নকশা বা গ্রাফিতির কথা বা ছবির গুণগত ও বৌদ্ধিক মান হতে হবে উঁচু দরের। খুব জটিল হবে তার কোনো মানে নেই কিন্তু আসল কথা হলো ডিসাইনটির সাথে যেন ক্রেতা যুক্ত হতে পারে বা কানেক্ট করতে পারে।

ডিসাইন ফাইলটি হতে হবে ন্যূনতম ৩০০ ডিজিটাল পিক্সেল প্রতি ইঞ্চে। ব্যাকগ্রাউন্ডটি হতে হবে স্বচ্ছ ও যথেষ্ট বড়। এটি যেন পুরো ছাপা জায়গাটি তে ব্যাপ্ত হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি আপনার ছাপার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হবে।

গুণগত মান:

আপনার টিশার্ট টির কোয়ালিটি বা কাপড়ের গুণগত মান যদি খারাপ হয় তাহলে শুধু নকশা দিয়ে মন ভোলানো যাবেনা। একবার কাচার পরেই যদি ডিজাইনটি  ছিঁড়ে যেতে শুরু করে বা টিশার্ট টাই ছোট হয়ে যায়, কেউ ভুলেও আপনার জিনিস দুবার কিনবে না। তার ওপর অনলাইনে খারাপ রিভিউ পাবেন। বেশি বিনিয়োগে উন্নততর টিশার্ট কিন্তু বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন। আর অবশ্যই মনে রাখবেন আপনার টিশার্টের চূড়ান্ত গুনাগুন নির্ভর করবে আসল কাপড়, ডিসাইন ছাপার পদ্ধতি ও ডিসাইন ফাইল তৈরির ওপর।

ব্র্যান্ড তৈরী করুন:

হাজারটা টিশার্ট সংস্থার ভিড়ে আপনার টিশার্ট গুলিকে আলাদা করে গড়ে তুলুন আপনার একটি অভিনব ভাবমূর্তি যা একাধারে আপনার কাপড়ের গুণ, আপনার শিল্পকলা আর আপনার নিশ্ এর সাক্ষর বহন করবে।

সংরক্ষণ:

এখানে আপনাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি নিজের উৎপাদনগুলি কোথায় সংরক্ষণ করতে চান? প্রযুক্তির বদান্যতায় এখন আপনার কাছে বিকল্প আছে। এক আপনি আপনার পণ্য ও ছাপার মেশিন নিজের কাছেই রাখলেন। দুই আপনি দ্বারস্থ হলেন কোনো অন ডিমান্ড প্রিন্টার বা ড্রপশিপ সংস্থার। এরা আপনার চাহিদা অনুযায়ী টিশার্ট ছেপে নিজেরাই পাঠিয়ে দেবে ক্রেতার কাছে। সেক্ষেত্রে আপনি সহজেই পেয়েগেলেন একটি দোকান ও বিতরণ ব্যবস্থা জায়গা বা লোকবল ছাড়াই। কিন্তু মনে রাখবেন নিজের সংরক্ষণে আপনার লভ্যাংশ বাড়বে। আর গুণগত মান আপনার নিরীক্ষণে থাকবে। মূলধন, লোকবল ও জায়গার অভাব না থাকলে নিজের প্রতিষ্ঠান খোলাই আদর্শ।

বিক্রির পদ্ধতি:

আর এখানেই আপনাকে আরো একবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি আপনার টিশার্ট কিভাবে বিক্রি করতে চান। প্রথাগত ভাবে না অনলাইনে। বাস্তব বুদ্ধি বলে এইধরণের টিশার্টের চাহিদা যাদের মধ্যে দেখা যায় সেই তরুণ প্রজন্মর কাছে পৌঁছতে গেলে অনলাইন ও ই কমার্স সাইট ছাড়া গতি নেই।

প্রযুক্তিগত দিকগুলি ভুলবেন না

  • টিশার্ট প্রিন্টিং এর পদ্ধতি ও মেশিন নিয়ে গবেষণা করে তবেই কিনবেন বা কোনো পরিষেবা ভাড়া করবেন। 
  • ডিজাইনের জন্য ভালো শিল্পীকে নিয়োগ করুন বা কোনো ফ্রীল্যান্স পরিষেবার সাহায্য নিন। ডিসাইন কিনতেও পাওয়া যায় তবে সেক্ষেত্রে আপনার টিশার্ট টির কোনো অভিনবত্ব থাকবে না।
  • টিশার্ট ডিজাইনের পর তার চূড়ান্ত রূপটি মক আপ করতে ভুলবেন না। আপনার বিজ্ঞাপনে আর অনলাইন উপস্থিতিতে অবশ্যই নিদর্শন রাখবেন যাতে ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়।
  • আপনার ডিজাইনের চাহিদা অবশ্যই আগে থেকে সমীক্ষা করে নেবেন। সোশ্যাল মিডিয়া, রেডিট, প্রিন্ট অন ডিমান্ড প্রভৃতি পরিষেবার সাহায্য নিতে পারেন।
  • শপিফাই এপ্লিকেশন টি আপনাকে সাহায্য করবে বিভিন্ন প্রিন্ট অন ডিমান্ড আর ড্রপশিপিং পরিষেবার সাথে আপনার ব্যবসাকে যুক্ত করে।
  • ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে অপ্টিমাইজ করুন। খুশি ক্রেতাকে পুনঃমূল্যায়ন বা রিভিউ লিখতে উৎসাহ দিন। পৌঁছে যান বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছে। রিমার্কেটিং এর সাহায্য নিন। একবার আপনার একটি টিশার্ট যদি কেউ শপিং কার্টে রাখেন, বার বার সেই জামার লিংক যেন সে দেখতে পায় সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন মঞ্চে।
  • ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে আপনি যত কষ্ট করেছেন সেগুলিকে সুরক্ষিত করুন ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট দিয়ে।
  • আইনি বৈধতা মেনে কাজ করুন। আপনার ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র, কর ও বিশেষ করে জি এস টি নথিভুক্ত করতে অবশ্যই ভুলবেন না।
  • বৈধ ডোমেন পরিচয়ের ওয়েবসাইট, ইমেল আইডি, ব্র্যান্ডের নাম সবার আগে নথিভুক্ত করবেন।
  • বিনিয়োগ করতে ভুলবেন না ভালো ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফারের জন্য। সার্ভার হোস্টিং সার্ভিসের সুরক্ষা নিতে পারেন।
  • বাজারের হালহকিকত সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা থাকা দরকার। মূলধন জোগাড় থেকে পরিবহন ও সরবরাহের খরচের হার কিরকম সেসব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করে টিশার্ট এর মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

অবশেষে যেটা বলার কাস্টম ডিজাইনের টিশার্ট ব্যবসায় তুলনামূলক ভাবে বিনিয়োগ কম লাগলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। এই ব্যবসায় নামলে তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান সবল থাকতে হবে। তাই ওপরে বলা প্রত্যেকটি পয়েন্ট নিয়ে বিশেষ ভাবে গবেষণা করা উচিত।

 

Related Posts

Leave a Comment